চাকরী খুঁজছেন?

Click Here For Online Apply

Wednesday, July 17, 2019

এক জোড়া মোজা, একটি ছোট গল্প।

আমাদের ছেলেটা যখন প্রথমবার ওর মায়ের পেটের ভেতর নড়াচড়া করে উঠে আমরা দুইজনই আধা ঘন্টার মতন বাকরুদ্ধ হয়ে ছিলাম। এখানে বাকরুদ্ধ শব্দটা দিয়ে আমি ঠিক বোঝাতে পারব না আমাদের তখন কেমন অবস্থা হয়েছিল! দুইজন দুইজনের চোখের দিকে চেয়েছিলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না একটা প্রাণকে দুনিয়াতে নিয়ে আসার ব্যাবস্থা করে ফেলেছি আমরা। তাও আবার ভালবেসে। আমাদের ভালবাসা থেকে।
প্রথম যেদিন ওকে দেখি আল্ট্রাসনোগ্রাম করার সময় ... আমরা দুইজন দুইজনের হাত এত শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম ... এত শক্ত করে ... পরের কয়েক ঘন্টা আমাদের হাত ব্যাথা করছিল... ছেলের মায়ের হাত তো ফুলেই গিয়েছিল!
কেনাকাটা শুরু করে দিলাম আমরা। তিনসেট জামা কিনলাম। নীল নীল দুই জোড়া মোজা পছন্দ হল। একটা মোজা নিয়ে দেখি আমার আঙ্গুলের চেয়ে একটু বড়। এত ছোট পা কেমন করে হয় একজন মানুষের বাচ্চার!? মোজাটা কেনার পর থেকেই পায়ের আঙ্গুলগুলো কামাড়ানোর ইচ্ছা শুরু হল আমার। আচ্ছা, পায়ের আঙ্গুলে টুকটুক করে কামড় দিলে ও কী খিল খিল করে হাসবে আমার মতন!? নাকি ওর মায়ের মত অল্প একটু মুচকী হাসি দিয়ে তাকিয়ে থাকবে চুপচাপ!
একটা বেবি কট কিনে নিয়ে আসলাম আমি একদিন। একা একাই। বাসায় আসার পরেই ওর মায়ের সে কী হাসি! বেবি কটটা ছিল গোলাপী। ছেলেদের বেবি কট নাকি গোলাপী রঙের হলে হবে না... এইটা নাকি মেয়েলি মেয়েলি। কী আর করা! ছেলের মাকে নিয়ে গিয়ে আকাশনীল একটা বেবি কট নিয়ে আসলাম। মাঝে মাঝে মাঝরাতের দিকে আমি আর ওর মা এমনি এমনি জেগে বসে রইতাম বেবি কটটার পাশে। আমাদের ঘুম আসত না, আমাদের সময় কাটত না। আমরা বেবি কটটার কাঠের পাশগুলাতে হাত বুলাতাম। আমাদের এই কাঠের টুকরোগুলোকেও আপন মনে হত। খুব আপন। আমাদের সময় ফুরোত না।
কয়েক সপ্তাহ পর ডক্টর জানালেন আমাদের ছেলেটার বৃদ্ধি ঠিক স্বাভাবিক নয়। প্রথমে আমরা বুঝতেই পারিনি ব্যাপারটা কী। উনি ওর মাকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে জানালেন ছেলেটার হার্ট কোন কারণে ঠিকভাবে বেড়ে উঠছে না। এর ফলে ওর শরীরের বৃদ্ধিও হচ্ছে না যেভাবে হওয়া দরকার ছিল। তবে, হয়ত পরের সপ্তাহগুলোতে এটা ঠিক হয়ে যাবে। হয়ত!
কয়েকদিন আমাদের সময় একেবারেই থমকে গেল। আমরা এমনকি ঠিকমত কথা বলাও ভুলে গেলাম। আমাদের মনে হল শব্দগুলো সেদিন সেই ডক্টরের চেম্বারেই রয়ে গেছে। আমরা চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমাদের মনে হল আমাদের ঘরের বাইরের সময়গুলো টিকটিক করে সামনে আগায় ... মেঘগুলো সাদাটে হয়ে আকাশ পাড়ি দেয়... পাখিরা গুনগুন করে টিকটিক সময়ে সুর তুলে মেঘেদের মন রাঙায় ...! শুধু আমাদের ঘরের ভেতরেই সব থমকে আছে... শুধু আমাদের ঘরের ঘড়িটাই ভুলে গেছে কাঁটা নাড়াতে... আমাদের ঘরের ভেতরেই দমবন্ধ কুয়াশা মেঘেদের ওড়াওড়ি থামিয়ে দেয়... আমাদের ঘরে কোন সুর নেই। হয়ত ছিল না, হয়ত আসবে না।
কয়েকদিন গেল এভাবে। এরপর যেন কোন এক জাদুবলে আমাদের হুঁশ ফিরে এলো... আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের কিছু একটা করতে হবে... আমাদের অনেক কিছু করতে হবে... ছেলের মা খাওয়া দাওয়া বাড়িয়ে দিল। আমি নেট ঘেটে ঘেটে বের করতে থাকলাম একজন মায়ের ঠিক ওইসময়ে কি কি খেলে ভেতরের প্রাণটা বেড়ে উঠতে পারে ঠিকঠাক ভাবে।
অনুমিত সময়ের সতেরদিন আগেই অপারেশান করে আমাদের ছেলেকে দুনিয়াতে আনা হল। দুই কেজি সাতশ গ্রাম ওজন সাকুল্যে। এবং তখনো ওর রিদয় ঠিক ঠিক ভাবে চলতে শিখেনি। ওকে একটা আবদ্ধ রুমে একটা আবদ্ধ বাক্সে আটকে রাখল। যত্ন নিতে।
আমরা বাক্সের বাইরে থাকি। ঘুরাঘুরি করি। আমার পকেটেই থাকে মোজা জোড়া। কেনার পর থেকে একদিনের জন্যেও ওই এক আঙ্গুল সমান মোজা আমার পকেট ছাড়েনি আর আমার জান বাবাটার পায়ের টুকটুকে আঙ্গুলগুলোয় কামড়ানোর ইচ্ছা আমার মাথা থেকে বের হয়নি।
আমরা বাক্স বাক্স রুমটার আশেপাশে ঘুরাঘুরি করি। আমি আর ওর মা। বাক্সটার ভেতর আমাদের জান আটকে আছে।
প্রথমে ডক্টর জানালেন ওর হার্ট সম্ভবত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। ও হয়ত একদম স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। ওর বাক্স জীবনের ছয়তম দিনে দেখা গেল ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঘন্টা ধরে ধরে ওর কষ্ট বাড়ছিল। ডক্টররা বড় ডক্টরদের ডাকলেন। তিন চারজন ডক্টর এক হলেন। আমাদের ডাকলেন। আমাদের জানালেন ওর বুকটা কাটতে হবে। সেখানে কিছু খটমট জিনিস বসাবে।
কেমন করে!? কেমন করে ওইটুকু বুকে ছুরি চালাবে? সেই ছুরিটাও কি কান্না করবে না?
ওইটুকু বুকে কেমন করে যন্ত্রপাতির জায়গা হবে?
আমরা বাক্সের বাইরেই ঘুরাঘুরি করি। আমাদের মাথায় এখন মেঘেরা সাদা থেকে কালো কালো হয়ে উঠছে। আমরা পারছি না মেঘেদের কালো হওয়া থামাতে। আমরা বাক্সের বাইরে ঘুরি।
সন্ধ্যার দিকে সাদা আলখেল্লা পরা বড় বড় ডক্টররা আমাদের জান বাবাটাকে নিয়ে গেল। অপারেশান করবে। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম একটা করিডোরের এক মাথায়। এই করিডরটার বাতিগুলো আলো দিচ্ছে না আমাদের চোখে। আমাদের চোখ নোনা হয়ে গেছে... নোনা চোখে আলো দেয়ার মত বাতি নেই দুনিয়াতে।
ছয় ঘন্টা আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম করিডরে আলো জ্বলার আশায়। আমরা দাঁড়িয়েই ছিলাম। কখনো আমি ওর মাকে ধরে ভর নিয়েছি, কখনো ওর মা আমাকে ধরে ভর নিয়েছে। আমরা একবারের জন্যেও বসিনি। আমরা একবারের জন্যেও করিডর থেকে চোখ সরাইনি। তিন সেট নীল নীল জামা কেনা আছে বাসায়। আমরা এই করিডরে অপেক্ষায় আছি সেই জামাগুলো একটা শরীরে পরাতে পারব সেই বাক্য শোনার জন্যে।
দুইজন কম বয়সী ডক্টর বের হয়ে এলেন। চলে গেলেন। মুখে হাসি ছিল না। মুখে কোন অভিব্যক্তি ছিল না। উনারা আমাদের দিকে তাকাননি। উনারা আমাদের উপস্থিতি যেন টের পাননি।
আরো আরো সহস্র মুহূর্ত পরে একজন বয়স্ক ডক্টর বের হয়ে এলেন। উনার মুখে পরাজিত সৈনিকের ঝুলে যাওয়া হাসি।
আমাদের জান বাবাটার থুতনিতে তখনো এক ফোঁটা রক্ত লেগে ছিল। আমি একবার ছুঁয়ে দিলাম থুতনিটা। ঠিক রক্ত বিন্দুটায়। ওর মা ছুয়ে দিল আমাদের বাবুটার চোখটা, কপালটা। ওর মা জানটুশটার পায়ের একটা আঙ্গুল ধরে রইল। ধরেই রইল... যেন আঙ্গুলটা চলে যাবে কোথাও...
আমরা শব্দ করিনি। আমাদের শব্দ ছিল না। শব্দ আমাদের থেকে তখন হাজার মাইল দূরে। কোন এক বরফ ঢাকা পর্বতের এ প্রান্ত ও প্রান্ত ঘুরছে। বের হতে পারছে না। পথ হারিয়েছে। ঠান্ডায় জমে গেছে। শব্দেরা আমাদের কাছে আসতে চাইছে। পারছে না। আমাদের নিঃশ্বাসে তখন মরুভূমির উত্তাপ। আমাদের চোখে তখন একদল নোনা মেঘ ঘূর্ণি পাকাবে বলে ঘুর ঘুর করছে। আমরা অনড়, আমরা নিশ্চল, আমরা নির্বাক।
শুধু আমাদের ছেলের মা একটা পায়ের আঙ্গুল ছুঁয়ে আছে। আর আমি একটুখানি চিবুকে একফোঁটা রক্তে আটকে আছি।
আমার ছেলেটার মা আর কোনদিন শব্দ খুজে পায়নি। আমার ছেলেটার মা আর কোনদিন মুচকি হাসিতে দুনিয়া রাঙায়নি।
আমি আর কখনো ওই এক আঙ্গুল সমান একটা মোজা আমার পকেট থেকে বের করে কারো পায়ে পরিয়ে দিতে পারিনি।
কেন এমন হল? কেন এমন হয়? যিনি প্রাণ দেন, যিনি শুন্য থেকে প্রাণ আনেন তিনি কেন এমন করে সেই প্রাণের বুকে ছুরি চালানোর মত কিছু করে দেন!? চাইলে কি তিনি ভিন্নভাবে তাঁর সৃষ্টি সাজাতে পারতেন না!?
এরপরেও আমি বাইরে যাই, ঘরে ফিরি। এরপরেও আমার দিন কাটে। এরপরেও আমি বেঁচে আছি।
এমন নয় যে জীবন খুব খাতির-যত্ন করে চেপে-চুপে প্রতিদিন আমায় ডেকে বলছে, 'বেঁচে থাকো, বেঁচে থাকো'! তবু আমি বেঁচে থাকি, বেঁচে আছি। তবে এই বেঁচে থাকায় স্বাদ পাই না, ঘ্রাণ পাই না ... বেঁচে থাকার। শুধু... মাঝে মাঝে মনে হয় আমি এর শেষটা দেখতে চাই। শুধু মনে হয় আমি এর মানেটা খুঁজে পেতে চাই।

No comments:

Post a Comment

Thanks For Stay With Us